Breaking News
Home / বাংলা টিপস / হীরকজয়ন্তীতে হিরণ্ময় বিদ্যাপীঠ স্মৃতিকথা

হীরকজয়ন্তীতে হিরণ্ময় বিদ্যাপীঠ স্মৃতিকথা

সরকারি জুবিলী স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেছি ১৯৭৯ সালে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পালা। ঐতিহ্যবাহী পটুয়াখালী সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয় বছরের মাঝামাঝি। বৃহত্তর পটুয়াখালী (পটুয়াখালী ও বরগুনা) জেলায় তখন এটিই ছিল একমাত্র সরকারি কলেজ। বন্ধুরা প্রায় সবাই ভর্তি হলো এ কলেজে। অধিকাংশই বেছে নেয় বিজ্ঞান বিভাগ।স্পষ্ট মনে আছে, পারিবারিক চাপে আমি তখন দৌড়ঝাঁপ দিচ্ছিলাম মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির জন্য। ফল বেরোনোর আগেই ‘অ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট’ দিয়ে মেরিন একাডেমিতে ভর্তির উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের জলদিয়ায় ছুটে যাই। সেখানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এক অভিযান শেষে ফিরে আসি রাজধানী ঢাকায়। আস্তানা গাড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলে মেজ ভাইয়ের রুমে। উদ্দেশ্য, ঢাকা কলেজে ভর্তি। যথারীতি এখানেও ভর্তির সুযোগ হয়নি। অগত্যা ব্যর্থ হয়ে আবার ছুটে যাই চট্টগ্রাম। কালবিলম্ব না করে ভর্তি হই চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে। পরে সিদ্ধান্ত বদলে হাজী মহসিন কলেজে এবং সর্বশেষ ওমর গণি এমইএস কলেজের ছাত্রত্ব গ্রহণ করি। কিন্তু কলেজে আর যাওয়া হচ্ছিল না। শিক্ষকদের ধর্মঘটের কারণে অনেক দিন কাস বন্ধ ছিল। কী আর করা! আড্ডা দিয়েই সময় পার করছিলাম।

এক-আধটু রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়ি। প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর চশমা হিলের বাসায় বঙ্গবন্ধুর চতুর্থ শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদ ও গণভোজে অংশ নিই। ইতোমধ্যে মামার (আলহাজ নূরুল হক) কাছে পড়াশোনায় আমার অমনোযোগের খবর পৌঁছে যায়। চিঠি মারফত তিনি আমাকে চট্টগ্রাম ছেড়ে পটুয়াখালী আসার নির্দেশ দেন। লালমনিরহাট থেকে আব্বা-আম্মাও অভিন্ন মত দেন। শেষমেশ সেপ্টেম্বর মাসের কোনো একসময় মামা আসেন চট্টগ্রাম। তল্পিতল্পা গুটিয়ে পটুয়াখালী ফিরে আসতে বাধ্য হই তার সঙ্গে। পটুয়াখালী এসে দেখি, আমার সব বন্ধু সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে প্রায় তিন মাস ক্লাস করে ফেলেছে। অধ্যক্ষ স্যারের পরামর্শে বড় ভাই যশোর শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে আমাকে ভর্তি করিয়ে দেন পটুয়াখালী সরকারি কলেজে। শ্রেণি- ১১শ’, বিজ্ঞান; রোল নম্বর- ৬৫৫। শুরু হলো আমার কলেজ জীবনের স্থিতিশীল অধ্যায়।জুবিলী স্কুলে পড়ার সময় মুনসেফপাড়ায় মামার বাসায় থাকতাম। ইতোমধ্যে বড় ভাই (ডা. লুৎফর রহমান) ‘ডি’ টাইপ কোয়ার্টারে উঠেছেন। এই কোয়ার্টার থেকে কলেজে যাতায়াত করলেও আড্ডার জন্য নিয়মিত ছুটে বেড়াতাম শহরময়।

বন্ধুদের মধ্যে মুনসেফপাড়ার বাবুল, শাহীন (প্রয়াত নান্নু মিয়ার ছেলে, বর্তমানে প্রবাসী) ও আফজাল (রাজনীতিবিদ); সদর রোডের মলয়, তৌফিক, সুভাষ (প্রয়াত), মানিক (প্রয়াত) ও হাবিব (আজাদ বিড়ি); চরপাড়ার দুলাল (ডাক্তার স্বপন), মুনির (রাজনীতিবিদ), খোকা, ইউসুফ (পাঙ্গাশিয়া) ও ইসরাইল (প্রয়াত); আদালতপাড়ার মাউড়া ঝন্টু, কিবরিয়া (ডাক্তার) ও এনায়েত (সাংবাদিক); পুরান বাজারের খাটো মুকুল (প্রবাসী), খোকন (মুরাদিয়া স্টোর) ও মানিক (ডাক্তার); নবাবপাড়ার মজনু ও আযম; মুসলিমপাড়ার আজাদ (আজাদ ভবন); জলের কল সড়কের মাসুম (ডাক্তার); গার্লস স্কুল রোডের জাকির (ফারুক মঞ্জিল) ও পিন্টু; এসডিও রোডের শাহীন; ডিসি রোডের সহিদুল (প্রয়াত হাশেম স্যারের ছেলে); কালিকাপুরের আলতাফ; হেঁতালিয়ার দেলোয়ার; পিটিআই রোডের আনিচ (শান্ত নীড়); জেলা জজের ছেলে হাবীব এবং ফেরিঘাট এলাকার জাহিদের সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এ ছাড়াও খাটো বাবুল, মনা, ফারুক, সুবির, নারায়ণ, আলতাফ, আলী, মাহবুব, মুসা, এনামুল, গিয়াস, মজিবর, খলিল, বশির, শহীদুল ও আরমানের নাম বেশ মনে আছে। কলেজের উত্তর-পূর্ব সীমানায় ইন্টারমিডিয়েট হোস্টেলে থাকত এদের কয়েকজন। পাকা ভিটির ওপর টিনের বেড়া ও টিনের ছাউনিবিশিষ্ট এই হোস্টেলের বন্ধুদেরও কম জ্বালাতন করিনি। প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল আমাদের মধ্যে।

উল্লেখ্য, পটুয়াখালী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে বরাবরই ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরা ভর্তি হতো। কিন্তু আমাদের ব্যাচটি ছিল ব্যতিক্রম। ১৯৭৯-৮০ শিক্ষাবর্ষে কোনো ছাত্রীকে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি করা হয়নি। পরে জেনেছি, আগের ব্যাচের কয়েকজন গুণধর (!) বড় ভাই একাধিক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করলে ত্যক্ত-বিরক্ত কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে কোনো ছাত্রীকে ভর্তি করেনি উচ্চ মাধ্যমিকে। পরের বছর থেকে যথারীতি ছাত্রী ভর্তি শুরু হলেও কলেজ জীবনে বান্ধবীহীন থেকে গেলাম আমরা!এবার আসি শ্রদ্ধেয় স্যারদের প্রসঙ্গে। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি পদার্থে মমিন স্যার, সুকুমার স্যার ও মিহির স্যার; রসায়নে রব্বানী স্যার ও জয়নুল স্যার; উদ্ভিদবিদ্যায় বুলবুল স্যার ও মান্নান স্যার এবং প্রাণিবিদ্যায় পরিমল স্যার। নৈর্বাচনিক গণিত পড়াতেন মফিজ স্যার ও ইউনুচ শরীফ স্যার। বাংলা ও ইংরেজি ক্লাস নিতেন যথাক্রমে আলী আহমেদ স্যার ও খোরশেদ আলম ফরাজী স্যার। বলা প্রয়োজন, পাঠক্রমে পিছিয়ে থাকায় ক্লাসের বাইরে মোমিন স্যারের কাছে পদার্থ, মঞ্জু স্যারের কাছে নৈর্বাচনিক গণিত ও রব স্যারের কাছে রসায়ন পড়েছি। স্যারদের কাছে আমার এই অপরিশোধ্য ঋণ আমৃত্যু মাথায় নিয়ে বেড়াব।

পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলার প্রতি বরাবরই আমার ঝোঁক ছিল। কলেজের হকি, ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল ও টেবিল টেনিসের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলাম। ক্লাস শুরুর কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে কমন রুমে মুনসেফপাড়ার মামুন ভাই, বন্ধু হাবীব, সুবীর ও আমি নিয়মিত টেবিল টেনিস প্র্যাকটিস করতাম। আশাতীত সাফল্যও পেয়েছি এ ক্ষেত্রে। ১৯৮১ সালে পটুয়াখালী জেলা শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় বালক (খ) বিভাগে টেবিল টেনিসে প্রথম স্থান অধিকার করে খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ নিই। একক টেবিল টেনিসে নকআউট পর্বে যশোর জেলার প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে পরাজিত হয়ে বিদায় নিলেও দ্বৈত টেবিল টেনিসে শাহান (বন্ধু জাহিদের ছোট ভাই)সহ অংশ নিয়ে খুলনা বিভাগে রানার্সআপ হয়েছিলাম।মনে পড়ে, ক্লাসের ফাঁকে ইন্টারমিডিয়েট হোস্টেলে বন্ধুদের সঙ্গে প্রায় নিয়মিত ক্যারম খেলতাম। কলেজ শেষে প্রাইভেট পড়ে বাসায় আসার পর পিডিএসএ মাঠে হকি খেলতাম। প্রয়াত খোকনদা, আলম ভাই, মামুন ভাই, জামালদা, প্রয়াত সবুজ ভাই, বন্ধু বাবুল ও প্রয়াত রব্বানীও মাঝেমধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগ দিত। স্কুলে পড়লেও আমার ভাগ্নে বাপ্পীও হকি খেলায় অংশ নিত আমাদের সঙ্গে। বলা বাহুল্য, পটুয়াখালী কলেজ দল আমাদের সময়ে হকিতে খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

বন্ধের দিনে কিংবা কলেজ ছুটিতে প্রয়াত গৌতমদা, প্রয়াত খোকনদা, সিদ্দিক ভাই, নান্টুদা ও আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে পিডিএসএ মাঠে ক্রিকেট খেলতাম। বন্ধু তৌফিক, ঝন্টুদা, প্রয়াত পল্টুদা, প্রয়াত সবুজ ভাই ও নিজাম ভাইয়ের সঙ্গে বাস্কেট বলও খেলতাম। ফুটবলও বাদ ছিল না। ১৯৮০ সালে বার্ষিক সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সপ্তাহে ফুটবল খেলায় আমাদের একাদশ বিজ্ঞান দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। টিমের একজন সদস্য হিসেবে আমিও ‘অভিজ্ঞানপত্র’ পেয়েছিলাম, যা আজও আমার সংগ্রহে আছে।আমার সৌভাগ্য, কলেজ ছাত্র সংসদের উদ্যোগে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলাম। ১৯৮০ সালের ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেছিলেন জেলা প্রশাসক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শওকত আলী। আমি ছাড়াও বন্ধুদের মধ্যে স্বপন, হাবীব, মোস্তাফিজ, অহেদুল, খোকা, নেওয়াজ ও প্রয়াত ইসরাইল এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। মনে আছে, ৮০০ মিটার ও ১৬০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় আমি যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জন করি। কী যে আনন্দ! সেদিনের সেই অনুভূতি আজও অনুভব করি।

সবশেষে পরীক্ষা প্রসঙ্গ। ১৯৮১ সালের ২১ মে তারিখে আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। বিজ্ঞান বিভাগে আমরা ১১৬ জন পরীক্ষার্থী ছিলাম। থিওরি পরীক্ষা সম্পন্ন হয় ২০ দিনে। পরবর্তী ১০ দিন কোনো পরীক্ষা ছিল না। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার জন্য এ সময় কলেজ ল্যাবে প্র্যাকটিস করেছি। পদার্থবিজ্ঞানের মঞ্জুর স্যার, রসায়নের রব স্যার এবং জীববিজ্ঞানের ইসমাইল স্যার পরম মমতায় আমাদের হাতেকলমে শিখিয়েছেন। সর্বোচ্চ প্রস্তুতিসহ ২২-২৪ জুন ১৯৮১ তারিখে অনুষ্ঠিত প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় অংশ নিই। এক্সটার্নাল পরীক্ষক হিসেবে বরিশাল বিএম কলেজ, যশোর এমএম কলেজ ও খুলনা বিএল কলেজের স্যাররা যথাক্রমে পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও রসায়নের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা নেন। এর মধ্য দিয়েই চূড়ান্তভাবে শেষ হয় ১৯৭৯-৮০ শিক্ষাবর্ষের এইচএসসি পরীক্ষা পর্ব। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় আমার কলেজ জীবন। প্রিয় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক চিরদিন অবিচ্ছেদ্য থাকবে। জয়তু পটুয়াখালী কলেজ!পুনশ্চ :কলেজ জীবনে পড়াশোনা ও খেলাধুলার বাইরে ছাত্র রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত ছিলাম। ১৯৭৯-৮০ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের মান্নান-তসলিম প্যানেলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিই। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে জিএস ব্যতীত পুরো প্যানেলে ছাত্রলীগ জয়লাভ করে। পরের বছর অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও ছাত্রলীগ প্যানেলের সমর্থনে কাজ করি। আমার কলেজ জীবনের সর্বশেষ এই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে রেকর্ড সৃষ্টি করে মান্নান ভাই দ্বিতীয়বারের মতো ভিপি নির্বাচিত হন। বিনম্র শ্রদ্ধা তাদের সবার প্রতি।

About admin

Check Also

দলের সঙ্গে সিলেট যাননি মাশরাফি

আগামী এপ্রিলে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট খেলতে আবারও পাকিস্তান যাবে বাংলাদেশ। এই ম্যাচের দু’দিন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *